সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৫

শিক্ষকের মর্যাদা


কাজী কাদের নেওয়াজ
=================

বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।
শিক্ষক মৌলভী
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।
দিল্লীপতির পুত্রের করে
লইয়াছে পানি চরণের পরে,
স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে!
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে।
হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,
ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।
যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।
তার পরদিন প্রাতে
বাদশাহর দূত শিক্ষকে ডেকে নিয়ে গেল কেল্লাতে।
খাস কামরাতে যবে
শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, ”শুনুন জনাব তবে,
পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে?
বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা,
নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা”
শিক্ষক কন-”জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়,
কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?”
বাদশাহ্ কহেন, ”সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।”
উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
”আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।”


[দু'টি কথা: সেই শিশু বয়সে পড়েছিলাম কবিতাটি, সবটুকু মনে ছিলো না। স্মৃতি হাতড়ে আর নেট ঘেঁটে পুরো কবিতাটি পেয়ে গেলাম। যদিও আজকের দিনে এইমতো পৌরানিক কবিতা নিতান্তই বে-রসা।  এখনকার সময়ে এসব কবিতার খাওতা নেই। এখনকার সময়ের বিষয়বস্তু নীতিশিক্ষা নয় বরং ক্ষমতাশিক্ষা। তাই তো সমাজের আজ এই দশা। 

সত্যি "লজ্জিত" বলা ছাড়া আর কী-ইবা বলার আছে?]

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৫

আমার কৈফিয়ত

কাজী নজরুল ইসলাম
==============
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুজে তাই সই সবি !
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে !
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে –বাণী কই, কবি ?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী !
কবি বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে ।
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাঁশ ঠেলে ।
পড়েনাক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা ।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা ।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হ’য়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে ।
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো, ফের যেন তুই যা’স জেলে ।
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচা ।
প্রতি শনিবারই চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা !’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি-‌’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা !
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা !

মৌ-লোভী যত মৌলভী আর 'মোল-লারা' ক'ন হাত নেড়ে,
'দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে !'
ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও !
'আম পারা'-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে !'
হিন্দুরা ভাবে, 'পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা'ত-নেড়ে !
আনকোরা যত ননভায়োলেন্ট নন্-কো'র দলও নন্ খুশী ।
'ভায়োলেন্সের ভায়োলিন' নাকি আমি, বিপ্লবী -মন তুষি ।
'এটা অহিংস', বিপ্লবী ভাবে,
'নয় চরকরা গান কেন গা'বে ?'
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কনফুসি !
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের অঙ্কুশি !
নর ভাবে , আমি বড় নারী -ঘেঁষা ! নারী ভাবে, নারী বিদ্বেষী ।
'বিলেত ফেরনী ?' প্রবাসী বন্ধু ক'ন, এই তব বিদ্যে ছি !
ভক্তরা বলে, 'নবযুগ-রবি !'-
যুগের না হই, হুজুগের কবি
বটি তো রে দাদা , আমি মনে ভাবি, আর ক'ষে কষি হৃদ- পেশী,
দু'কানে চশমা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ'তেছে নিদ্ বেশী !
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুন্ডু, আমিই কি বুঝি তার কিছু ?
হাত উঁচু আর হ'ল না তো ভাই, তাই লিখি ক'রে ঘাড় নীচু !


বন্ধু ! তোমরা দিলেনাক' দান,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান !
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব'লে অ-মূল্যে নেন ! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরেছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু ?

বন্ধু ! তুমিতো দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হল, শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে !
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তারে করিল বিকল,
তবু যদি কথা শুনে সে পাগল ! মানিল না রবি-গান্ধীরে !
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে !

আমি বলি, ওরে কথা শোন ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস খোশহালে !
প্রায় 'হাফ' নেতা হয়ে উঠেছিস, এবার এ দাঁও ফসকালে
'ফুল'-নেতা আর হবিনে যে হায় !
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা ! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে ।

বোঝেনাক' সে যে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে
গান শুনে সবে ভাবে, ভাবনা কি ! দিন যাবে এবে পান খেয়ে ।
রবেনাক' ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ'ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে ।
মাতা কয়, ওরে চুপ্ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্ চেয়ে !

ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত , একটু নুন,
বেলা ব'য়ে যায়, খায়নিক' বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন ।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায় !
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছ কি ? কালি ও চুন
কেন ওঠেনাক' তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন ?
আমরা তো জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস ।
কত শত কোটী ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটী টাকা, এল না স্বরাজ !
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ ।

মা'র বুক হতে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস !
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ !
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে,
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে,
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসেনাক' মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে !
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে !
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার ওপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে ।
প্রার্থনা ক'রো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটী মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ ।
=======================================
তোমার কবিতায় তোমাকে বিনম্র শ্রদ্ধা, হে কালজয়ী কবি !

বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৫

উত্তরণের আছে কী কোনো পথ?

'ঘুড়ির হাতে বাঁশের নাটাই উড়তে থাকে ছেলে 
বড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে মাছেরা ছিপ ফেলে'


লাইন দু'টি মনে আছে। কে লিখেছিলেন, মনে নেই। সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ছড়াকার ও কবি সুকুমার রায়ের লেখা। কবে পড়েছিলাম, তা মনে নেই। কোথায় পড়েছিলাম তাও মনে নেই। তবে তা বেশ মনে আছে, ছড়াটি যে আমাদের দেশের কোনো শ্রেণীতেই পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলনা। থাকবে কী করে? এখানে তো মানুষকে সরেষ আর সাহিত্যানুরাগী মানুষ বানানোর জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করার সুযোগ নেই। বরং এখানে দরকার ধর্ম ব্যবসার প্রসারের কলাকৌশল সম্বলিত ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা। সরকারকে তো তাই করতে হবে। জনচাহিদা বলে কথা!

এসব আবোল তাবোল পড়ে লাভ কী? এখানে না আছে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন, না আছে উদারনৈতিক সাহিত্য আর মৌলিক শিক্ষার প্রয়োজন। এখনকার সময়ে আদর্শলিপি'র শিক্ষা "ঔ তে ঔদার্য্য অতি মহৎ গুণ" দেখানোর টাইম কই? তার বদলে "ক -তে কঠোর হও কসাইর মতো" মতো জীবনমুখী! ধর্মমুখী! বাস্তবমুখী! সৃজনশীল! কত কায়দার শিক্ষায় জাতি শিক্ষিত হচ্ছে!


যাক সে কথা, একটু ভাবলেই বোঝা যায় এদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলোর ক্ষমতা কেন্দ্রিক দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতিগ্রস্থ আর সমাজবিরোধী অপশক্তিগুলির শক্তিমত্তা, আরও "প্রকাশযোগ্য নহে" এমন অসংখ্য অসংখ্য বিষয় বিবেচনায় নিলে শিশুতোষ আর মজার এ ছড়াটি এখন কী ভীষণ রকমের বাস্তব!

কথা একটাই, এর থেকে উত্তরণের আছে কী কোনো পথ?

সামু ব্লগে প্রকাশিত

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৫

ঝড়, নারী ও নর

ক্ষুদ্র জীবনেও অবশিষ্ট আগামী দিনগুলি নিয়ে আমার যত ভাবনা! 
দিনরাত উদভ্রান্তের মতো ছুটে চলা, এ রাজ্য থেকে ভাবনার সে রাজ্যে;
কখনও আন্দোলিত হই, কখনও শিহরিত হই সুমুখে আলোক নাচন দেখে!
জীবন তো নয়, আমার কাছে 'সময়' যেন বয়ে চলা বিধ্বংশী ঝড়!
তুমি তো আছো বেশ!
এসবে তোমার আঁচ লাগেনা, এখন তোমার দুষ্টু সময়!

চতুর্মাত্রিক-এ প্রকাশিত

০৪ জুন-২০১৫ ইং